মাদক, মব সংস্কৃতি ও বিচারহীনতা: পশুবৃত্তির অন্ধকারে সমাজব্যবস্থা
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 23 May, 2026
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের অপরাধের পরিসংখ্যান ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে একটি ভীতিকর চিত্র ফুটে ওঠে। বিশেষ করে অতি সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা এবং চট্টগ্রামে দুই শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার মতো ঘটনা জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তার চরম সংকট তৈরি করেছে। আইন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে বিচারের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হলেও, সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠেছে—সমাজ হঠাৎ এতটা সহিংস এবং বিকৃতমুখী হয়ে উঠছে কেন?
১. বাংলাদেশে অপরাধের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও শিশু হত্যা
মানবাধিকার সংস্থা ‘কোয়ালিশন ফর অ্যাডভান্সিং ইকুয়ালিটি অ্যান্ড জাস্টিস’ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান (২০২৬) অনুযায়ী, বিগত বছরগুলোর তুলনায় নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
২০২৫ সালে দেশে নথিভুক্ত মোট মামলার একটি বড় অংশই ছিল নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত (প্রায় ২১,৯৩৬টি মামলা)। সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধীরা কেবল শিশু বা নারীদের ওপর যৌন নির্যাতন চালিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না; প্রমাণ লোপাট করতে বা বিকৃত মনস্তত্ত্বের বশে ভুক্তভোগীকে শ্বাসরোধ করে বা গলা কেটে হত্যা করছে। পল্লবীর সাম্প্রতিক ঘটনাটি এর অন্যতম নিকৃষ্ট উদাহরণ, যা দেশের শিশু সুরক্ষার সাংবিধানিক ও নৈতিক ভিত্তিকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
২. সহিংসতা ও ধর্ষণ বাড়ার বহুমাত্রিক কারণ
সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধবিজ্ঞানী এবং মনস্তত্ত্ববিদদের গবেষণায় বাংলাদেশে এই অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে একক কোনো কারণ নয়, বরং বেশ কয়েকটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের উপাদানকে দায়ী করা হয়েছে:
ক) বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের অভাব
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে মামলার জট এবং ধীরগতির বিচার প্রক্রিয়া অপরাধীদের মনে এক ধরণের অভয় অরণ্য তৈরি করেছে। গবেষণায় দেখা যায়, ধর্ষণের মামলায় সাজা হওয়ার হার অত্যন্ত কম (শতকরা মাত্র ৩ থেকে ৫ ভাগ)। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, সাক্ষী সুরক্ষা আইনের অভাব এবং প্রভাবশালী চক্রের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, যা নতুন অপরাধীদের উৎসাহিত করে।
খ) ভেঙে পড়া আইন-শৃঙ্খলা ও ‘মব সংস্কৃতি’ (Mob Culture)
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ২০২৫-২০২৬ সালের চলমান ট্রানজিশনাল পিরিয়ডে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা সাময়িকভাবে শিথিল হওয়ায় অপরাধীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এছাড়া, সমাজে আইনের শাসনের বিকল্প হিসেবে গড়ে ওঠা **‘মব জাস্টিস’ বা উচ্ছৃঙ্খল গণবিচার সংস্কৃতি** অপরাধ প্রবণতাকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। যখন রাষ্ট্র ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায় এবং মানুষ নিজেই আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, তখন পুরো সমাজে একটি ‘নৈরাজ্যবাদ’ ও ‘সহিংস মানসিকতা’ ছড়িয়ে পড়ে। এই মব সংস্কৃতির ডামাডোলে অপরাধীরাও সুযোগ লুফে নেয়।
গ) অতিমাত্রায় মাদকাসক্ততা
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, শিশু ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সিংহভাগ ঘটনার পেছনে অপরাধীদের তীব্র মাদকাসক্তি (যেমন: ইয়াবা, আইস বা ক্রিস্টাল মেথ) সরাসরি দায়ী। মাদক মানুষের মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা এবং স্বাভাবিক নৈতিক বোধ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়, যার ফলে তারা অতিমাত্রায় পশুবৃত্তিক ও হিংস্র আচরণে লিপ্ত হয়।
ঘ) মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি এবং নৈতিক শিক্ষার অভাব
পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছে। শৈশব থেকে লিঙ্গ সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং নৈতিক শিক্ষার অভাবের কারণে এক ধরণের বিকৃত পুরুষতান্ত্রিক মনস্তত্ত্ব গড়ে উঠছে, যেখানে নারীকে ‘মানুষ’ না ভেবে কেবল ‘ভোগের বস্তু’ বা ‘দুর্বল প্রতিপক্ষ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ঙ) অনিয়ন্ত্রিত তথ্যপ্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের অপব্যবহার
স্মার্টফোন ও সস্তা ইন্টারনেটের কারণে পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এবং সাইবার অপরাধের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার তরুণ ও যুবসমাজের একটি বড় অংশকে মানসিকভাবে বিকৃত করে তুলছে। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রদর্শিত লাগামহীন সহিংসতা এবং বিকৃত যৌন কন্টেন্ট মানুষের সংবেদনশীলতাকে ভোঁতা করে দিচ্ছে।
চ) রাষ্ট্রের যথাযথ দায়িত্ব পালনে সীমাবদ্ধতা
ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা দেওয়া, দ্রুততম সময়ে ডিএনএ প্রোফাইলিং বা ফরেনসিক রিপোর্ট নিশ্চিত করা এবং অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে নজরদারি (যেমন সিসিটিভি ক্যামেরা বা পুলিশি টহল) বাড়ানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি রয়ে গেছে।
৩. আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্ষণের হার ও মনস্তত্ত্ব
জাতিসংঘের অপরাধ ও মাদক সংক্রান্ত কার্যালয় (UNODC) এবং ইউনিসেফের (UNICEF) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে বিশ্বব্যাপী ধর্ষণের হারের একটি তুলনামূলক চিত্র পাওয়া যায়।
উন্নত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইডেন এবং যুক্তরাজ্যে কাগজ-কলমে ধর্ষণের রিপোর্টিং বা মামলার হার অনেক বেশি দেখায়। তবে এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো—সেসব দেশের আইনি সংজ্ঞা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট (সম্মতিহীন যেকোনো যৌন স্পর্শই সেখানে আইনি ভাষায় ধর্ষণ) এবং নারীরা সেখানে মামলা করতে দ্বিধাবোধ করেন না।
অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে (বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান) সামাজিক মর্যাদা রক্ষা ও লোকলজ্জার ভয়ে বিপুল সংখ্যক ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়। ইউনিসেফের ‘হিডেন ইন প্লেইন সাইট’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় কিশোরী ও শিশু নির্যাতনের হার অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
উন্নত দেশের মানুষ কেন তুলনামূলকভাবে কম ধর্ষণমুখী?
নরওয়ে, ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড বা জাপানের মতো দেশগুলোতে অপরাধের সার্বিক হার, বিশেষ করে এই ধরণের বিকৃত অপরাধের হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এর পেছনের মূল কারণগুলো হলো:
┌────────────────────────────────────────────────────────┐
│ উন্নত দেশের অপরাধ প্রতিরোধের মূল স্তম্ভ
├────────────────────────────────────────────────────────┤
│ ১. দ্রুত ও নিশ্চিত বিচার (Swift and Certain Punishment)
│ ২. শৈশব থেকে প্রাতিষ্ঠানিক যৌন ও নৈতিক শিক্ষা
│ ৩. শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী (Social Security)
│ ৪. জেন্ডার ইকুয়ালিটি বা লিঙ্গ সমতার বাস্তবায়ন
└────────────────────────────────────────────────────────┘
অপরাধবিজ্ঞানের একটি মৌলিক সূত্র হলো—শাস্তির কঠোরতার চেয়ে শাস্তির ‘নিশ্চিত হওয়া’ অপরাধ দমনে বেশি কার্যকর। ওইসব দেশে অপরাধ করে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ সেখানে অপরাধীদের মনে ভীতি তৈরি করে।
যৌন শিক্ষা ও সুস্থ বিনোদন: উন্নত দেশগুলোতে স্কুল পর্যায় থেকেই বিজ্ঞানসম্মত ‘যৌন শিক্ষা’ (Sexual Education) এবং ‘সম্মতি’ (Consent)-র ধারণা শেখানো হয়। ফলে যৌনতা নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো বিকৃত কৌতূহল বা অবদমন তৈরি হয় না।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা: সেখানে কোনো ব্যক্তির মধ্যে মানসিক বিকৃতি বা আসক্তির লক্ষণ দেখা দিলে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাকে থেরাপি ও কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনা হয়, যা বাংলাদেশে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
৪. সংকট উত্তরণে করণীয়
বাংলাদেশকে এই অন্ধকার অধ্যায় থেকে বের করে আনতে হলে স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে:
১. দ্রুততম সময়ে বিচার : নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের অধীনে গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালগুলোতে মামলার ডেডলাইন (১৮০ দিন) কঠোরভাবে মেনে বিচার শেষ করতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দৃশ্যমান করতে হবে।
২. মব'র অবসান: আইনি ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফেরাতে পুলিশ প্রশাসনকে সংস্কার করে স্বাধীন ও কার্যকর করতে হবে, যাতে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সাহস না পায়।
৩. মাদক ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ: ডার্ক ওয়েব, পর্নোগ্রাফিক সাইট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে তৈরি বিকৃত কন্টেন্ট প্রতিরোধে সাইবার সিকিউরিটি সেলকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে মাদকের সরবরাহ চেইন ভেঙে দিতে হবে।
৪. পাঠ্যসূচিতে নৈতিকতা ও জেন্ডার সংবেদনশীলতা: প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শিশুদের গুড টাচ-ব্যাড টাচ এবং নারীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে।
৫. সামাজিক প্রতিরোধ: পাড়ায়-মহল্লায় শিশু সুরক্ষা কমিটি গঠন এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
পল্লবী বা চট্টগ্রামের ঘটনাগুলো কেবল একেকটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এগুলো আমাদের সামগ্রিক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ক্ষয়ে যাওয়ার অ্যালার্ম।
রাষ্ট্র যদি এখনই আইনের কঠোর শাসন এবং মনস্তাত্ত্বিক নিরাময়ের ব্যবস্থা না করে, তবে এই মব সংস্কৃতি এবং নৈতিক অবক্ষয় পুরো সমাজকে এক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে। প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন আর কেবল আইনি দায়িত্ব নয়, এটি বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

